বেগম খালেদা জিয়া
মোঃ জয়নাল আব্দীন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB)
নির্বাহী পরিচালক, অনলাইন ট্রেনিং একাডেমি (OTA)
মহাসচিব, ব্রাজিল–বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BBCCI)
বেগম খালেদা জিয়া (জন্ম: খালেদা খানম “পুতুল”) ছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতির এক প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৯৮৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নেতৃত্ব দেন এবং দুই দফায় (১৯৯১–১৯৯৬ ও ২০০১–২০০৬) সরকারপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থানের জন্য তিনি সুপরিচিত ছিলেন এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিকে প্রভাবিত করা দুই “বিরোধী বেগম”-এর একজন হিসেবে পরিচিত ছিলেন। দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় ৭৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়, যা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি যুগের অবসান নির্দেশ করে।
শৈশবকাল
বেগম খালেদা জিয়া ১৯৪৬ সালের ১৫ আগস্ট (কিছু সূত্র অনুযায়ী ১৯৪৫ সাল) তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রদেশের জলপাইগুড়িতে এক বাঙালি মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন চা ব্যবসায়ী ইস্কান্দার আলী মজুমদার ও তাইয়্যবা মজুমদারের পাঁচ সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর তাঁর পরিবার পূর্ববঙ্গের দিনাজপুরে স্থানান্তরিত হয়। শৈশবকালে তিনি দিনাজপুর মিশনারি স্কুলে এবং পরে দিনাজপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। ১৯৬০ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরবর্তীতে দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অল্প সময়ের জন্য পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি নিজেকে “স্বশিক্ষিত” হিসেবে উল্লেখ করেছেন এবং তাঁর কোনো উচ্চতর ডিগ্রি সম্পন্ন করার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। ১৯৬০ সালের আগস্ট মাসে তিনি সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন এবং এরপর থেকেই তিনি বেগম খালেদা জিয়া নামে পরিচিত হন।
শিক্ষাজীবন
বেগম খালেদা জিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন মূলত মাধ্যমিক স্তরেই সীমাবদ্ধ ছিল। তিনি ১৯৬০ সালে সরকারি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরে দিনাজপুরের সুরেন্দ্রনাথ কলেজে অধ্যয়ন করেন। তবে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার কোনো নথিভুক্ত প্রমাণ নেই। পরবর্তীকালে তিনি নিজেকে স্বশিক্ষিত বলে উল্লেখ করেন। তবুও তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা তাঁকে ভাষা ও সাংস্কৃতিক চর্চায় একটি দৃঢ় ভিত্তি প্রদান করে। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহের পর তিনি ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে বসবাস করেন, যা তাঁর শিক্ষাজীবন আরও ব্যাহত করে।

পেশাগত জীবন
রাজনীতির বাইরে বেগম খালেদা জিয়া কোনো স্বতন্ত্র পেশাগত জীবন গড়ে তোলেননি। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্ত্রী হিসেবে তিনি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ফার্স্ট লেডি ছিলেন এবং এ সময়ে সমাজকল্যাণ ও দাতব্য কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি সম্পূর্ণরূপে রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৮২ সালের জানুয়ারিতে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপিতে যোগ দেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৮৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবনই মূলত তাঁর পেশাগত পরিচয় নির্ধারণ করে, যার মাধ্যমে তিনি মুসলিম বিশ্বে অন্যতম প্রথম নারী সরকারপ্রধান হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেন।
রাজনৈতিক জীবন
বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় ১৯৮২ সালে, যখন বিএনপির নেতারা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর পর দলকে সংগঠিত রাখতে তাঁকে নেতৃত্বে আসার অনুরোধ জানান। ১৯৮৩ সালে তিনি দলের সিনিয়র ভাইস-চেয়ারম্যান হন এবং ১৯৮৪ সালের ১০ মে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি একটি বৃহৎ গণদলে পরিণত হয়। আশির দশকে তিনি সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন এবং বারবার গ্রেপ্তার ও গৃহবন্দি হওয়া সত্ত্বেও আপস করেননি।
১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে তিনি প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ১৯৯৬ সালে স্বল্পমেয়াদে এবং ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পূর্ণ মেয়াদে আবারও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শাসনামলে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বেসরকারিকরণ এবং নারীশিক্ষা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর সরকার দুর্নীতি ও রাজনৈতিক সহিংসতার অভিযোগের মুখোমুখি হয়।
স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা
সামরিক শাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের বিরুদ্ধে আশির দশকের গণআন্দোলনে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন অন্যতম প্রধান নেতা। ১৯৮৩ সালে তাঁর নেতৃত্বে বিএনপি সাতদলীয় জোট গঠন করে এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে। তিনি ১৯৮৬ সালের সংসদ নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্ত নেন এবং এই সিদ্ধান্তে অটল থাকেন, যা তাঁকে “আপসহীন নেত্রী” হিসেবে পরিচিত করে তোলে। “এরশাদ হটাও” স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি একদফা আন্দোলন জোরদার করেন। দীর্ঘ আন্দোলনের ফলশ্রুতিতে ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এরশাদ পদত্যাগে বাধ্য হন এবং ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।

ভারতবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থান
বেগম খালেদা জিয়ার পররাষ্ট্রনীতিতে ভারত সম্পর্কে একটি সতর্ক ও জাতীয়তাবাদী অবস্থান লক্ষ্য করা যায়। তাঁর শাসনামলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রায়ই জটিল ও উত্তেজনাপূর্ণ ছিল। বিশেষ করে ২০০১–২০০৬ মেয়াদে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তিনি ভারতের ট্রানজিট সুবিধা প্রদান ও তিস্তা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। তাঁর এই অবস্থান তাঁকে জাতীয় স্বার্থরক্ষাকারী নেত্রী হিসেবে সমর্থকদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে, যদিও সমালোচকরা একে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য ক্ষতিকর বলে মনে করেন।
তাঁর জনপ্রিয় বার্তা
বেগম খালেদা জিয়া তাঁর সরাসরি ও উদ্দীপনামূলক বক্তব্যের জন্য পরিচিত ছিলেন। “এরশাদ হটাও” স্লোগানটি তাঁর নেতৃত্বেই গণমানুষের আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে। নির্বাচনী রাজনীতিতে আপস না করার অঙ্গীকার এবং স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। তাঁর বক্তব্যগুলোতে প্রায়ই গণতন্ত্র, জনগণের অধিকার ও স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের আহ্বান প্রতিফলিত হতো।
হাসিনা আমলে বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস
২০০৯ সালের পর শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা দায়ের হয়। ২০১৮ সালে তিনি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। তাঁর সমর্থকরা এসব মামলাকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেন। এই সময়ে তিনি ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি থাকেন এবং কার্যত রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
কারামুক্তি
২০২০ সালের অক্টোবরে গুরুতর অসুস্থতার কারণে মানবিক বিবেচনায় তাঁর সাজা স্থগিত করা হয় এবং তিনি গৃহবন্দি অবস্থায় মুক্তি পান। তবে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দীর্ঘদিন দেওয়া হয়নি। ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার তাঁর সাজা বাতিল করে তাঁকে সম্পূর্ণ মুক্তি দেয়। এরপর তিনি উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান এবং চিকিৎসা শেষে ২০২৫ সালে দেশে ফিরে আসেন।
অসুস্থতা ও চিকিৎসা
জীবনের শেষদিকে বেগম খালেদা জিয়া একাধিক গুরুতর রোগে আক্রান্ত ছিলেন। তিনি হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস ও লিভার সিরোসিসে ভুগছিলেন। ২০২৫ সালের শেষদিকে তিনি ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন, যেখানে তাঁর একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে পড়ে। উন্নত চিকিৎসা সত্ত্বেও তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।
মৃত্যু

দীর্ঘদিনের অসুস্থতার পর বেগম খালেদা জিয়া ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। তাঁর মৃত্যুতে সরকার জাতীয় শোক ঘোষণা করে এবং দেশজুড়ে শোকের ছায়া নেমে আসে।
নামাজে জানাজা
২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তাঁর নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। দেশি-বিদেশি বহু রাজনৈতিক নেতা, কূটনীতিক ও সাধারণ মানুষ এতে অংশগ্রহণ করেন। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর দাফন সম্পন্ন হয় এবং তাঁকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত করা হয়।

তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা
বেগম খালেদা জিয়ার জীবন বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীর নেতৃত্বের একটি অনন্য দৃষ্টান্ত। স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় অবদান এবং রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দৃঢ়তা তাঁর জীবনের প্রধান শিক্ষা। ব্যক্তিগত শোক ও রাজনৈতিক নির্যাতনের মধ্যেও তিনি দেশের মাটিতে থেকে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
উপসংহার
বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক অনন্য রাজনৈতিক চরিত্র। প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হননি, বরং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছেন। তাঁর জীবন ছিল সাফল্য, বিতর্ক, ত্যাগ ও সংগ্রামের সমন্বয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।