বাংলাদেশে ব্যবসার সুযোগসমূহ

বাংলাদেশে ব্যবসার সুযোগসমূহ

 

মোঃ জয়নাল আব্দীন
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশ (T&IB)
নির্বাহী পরিচালক, অনলাইন ট্রেনিং একাডেমি (OTA)
মহাসচিব, ব্রাজিল–বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (BBCCI)

 

বাংলাদেশ একটি দ্রুত বর্ধনশীল দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতি। এটি জিডিপির দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি (ভারতের পর) এবং নামমাত্র জিডিপির হিসাবে বিশ্বে ৩৪তম অবস্থানে রয়েছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রায় ৪৫০.১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছিল এবং বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪–৬ শতাংশ। প্রায় ১৭ কোটি ৩৬ লাখ জনসংখ্যা এবং দ্রুত সম্প্রসারিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির কারণে দেশটি একটি বিশাল ভোক্তা বাজারে পরিণত হয়েছে।

 

বাংলাদেশের অর্থনীতি ধীরে ধীরে কৃষিনির্ভরতা থেকে শিল্প ও সেবা খাতে স্থানান্তরিত হয়েছে।
বর্তমানে শিল্প খাত জিডিপির প্রায় ৩৮ শতাংশ এবং সেবা খাত প্রায় ৫১ শতাংশ অবদান রাখছে।
প্রধান শিল্পখাতগুলোর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, ওষুধ শিল্প, সিরামিক, স্টিল, তথ্যপ্রযুক্তি এবং আর্থিক সেবা।

 

তৈরি পোশাক শিল্পের কারণে বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ, এবং এই খাত একাই মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০–৮১ শতাংশ প্রদান করে।
এছাড়া পাট ও পাটজাত পণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত দ্রব্য, প্লাস্টিক পণ্য, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, ওষুধ, হিমায়িত মাছ ও চিংড়ি এবং আইটি সেবাও উল্লেখযোগ্য রপ্তানি পণ্য।

 

অন্যদিকে বাংলাদেশকে ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয় যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, জ্বালানি তেল, রাসায়নিক সার, স্টিল, ভোজ্য তেল, যানবাহন এবং খাদ্যশস্য আমদানির ওপর।
সার্বিকভাবে, বৃহৎ শ্রমশক্তি, স্বল্প উৎপাদন ব্যয়, রপ্তানিমুখী শিল্পভিত্তি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নীতিগত সংস্কারের কারণে বাংলাদেশ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ ও ব্যবসার জন্য একটি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় গন্তব্য।

 

স্থানীয় উদ্যোক্তাদের (বিশেষত এসএমই) জন্য বাংলাদেশে ব্যবসার সুযোগ

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) খাত।
এসএমই খাত জিডিপির প্রায় ২৫ শতাংশ অবদান রাখে এবং প্রায় ৭৮ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। সরকার এসএমই খাতের উন্নয়নে প্রশিক্ষণ, স্বল্পসুদে ঋণ এবং অবকাঠামোগত সহায়তা প্রদান করছে।

তৈরি পোশাক ও বস্ত্র ভ্যালু চেইনে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পোশাক, হোম টেক্সটাইল এবং নিটওয়্যার উৎপাদনের মাধ্যমে লাভবান হতে পারেন। হাতের তাঁত, রঙকরণ ইউনিট, পাটজাত ব্যাগ, চামড়ার মানিব্যাগ এবং নৃ-গোষ্ঠীগত পোশাকের দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চাহিদা ক্রমবর্ধমান।

 

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে বর্তমানে তিন লক্ষাধিক পেশাজীবী কর্মরত।
স্থানীয় স্টার্টআপ ও আইটি প্রতিষ্ঠান সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট, মোবাইল অ্যাপ, ই-কমার্স, ডিজিটাল মার্কেটিং এবং আউটসোর্সিং সেবায় বড় সুযোগ পাচ্ছে।

 

কৃষি ও কৃষিপ্রক্রিয়াজাত খাতে চালকল, তেলকল, মসলা প্রক্রিয়াজাতকরণ, দুগ্ধ ও পোল্ট্রি শিল্প, কোল্ড স্টোরেজ এবং জৈব সার উৎপাদনে স্থানীয় উদ্যোক্তারা সফল হতে পারেন।
মৎস্য ও চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ বিশেষ করে রপ্তানিমুখী একটি সম্ভাবনাময় খাত।

 

পাট ও হস্তশিল্প খাতে পরিবেশবান্ধব পাটব্যাগ, কার্পেট, জিও-টেক্সটাইল এবং হস্তশিল্পজাত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে।

 

চামড়া ও জুতা শিল্পে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানিকারক খাত হিসেবে পরিচিত।
ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা মানসম্মত জুতা, ব্যাগ এবং চামড়াজাত পোশাক উৎপাদনে মনোযোগ দিতে পারেন।

 

স্বাস্থ্য ও ওষুধ শিল্পে স্থানীয় উদ্যোক্তারা জেনেরিক ওষুধ, হারবাল মেডিসিন এবং সাধারণ চিকিৎসা সরঞ্জাম উৎপাদনে সুযোগ পাচ্ছেন।

 

খুচরা বাণিজ্য, ই-কমার্স, লজিস্টিকস ও কুরিয়ার সেবা, রেস্তোরাঁ এবং ফ্র্যাঞ্চাইজি ব্যবসাও মধ্যবিত্তের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে।

 

বাংলাদেশে ব্যবসার সুযোগসমূহ
বাংলাদেশে ব্যবসার সুযোগসমূহ

 

স্থানীয় বৃহৎ কোম্পানির জন্য ব্যবসার সুযোগ

বাংলাদেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীগুলো স্টিল, সিমেন্ট, জাহাজ নির্মাণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সুযোগ পাচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে এলএনজি টার্মিনাল, সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বিনিয়োগ লাভজনক হচ্ছে।

টেলিযোগাযোগ ও আইটি অবকাঠামো খাতে ৫জি, ফাইবার অপটিকস এবং ডেটা সেন্টার স্থাপন নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে।

ফার্মাসিউটিক্যাল, হাসপাতাল চেইন, ভোক্তা পণ্য, সুপারশপ এবং ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে বৃহৎ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ দ্রুত বাড়ছে।

 

বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার সুযোগ

বাংলাদেশ সরকার রপ্তানিমুখী উৎপাদন, অবকাঠামো, জ্বালানি, আইটি এবং আর্থিক খাতে বিদেশি বিনিয়োগ উৎসাহিত করছে।

বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে কর অবকাশ, শুল্কমুক্ত যন্ত্রপাতি আমদানি এবং মুনাফা প্রত্যাবর্তনের সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।

 

পোশাক, চামড়া, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, ওষুধ, আইটি সেবা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং অবকাঠামো প্রকল্পে যৌথ উদ্যোগ বা সরাসরি বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।

 

রপ্তানি ব্যবসার সুযোগ

তৈরি পোশাক এখনও বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্য হলেও চামড়া, জুতা, ওষুধ, হিমায়িত মাছ, পাটজাত পণ্য এবং আইটি সেবা রপ্তানিতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষত পরিবেশবান্ধব পণ্য ও ডিজিটাল সেবার বৈশ্বিক চাহিদা বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।

 

আমদানি ব্যবসার সুযোগ

শিল্প যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল, জ্বালানি, ইলেকট্রনিক্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম, ভোজ্য তেল এবং যানবাহন আমদানিতে বড় বাজার রয়েছে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সরঞ্জাম এবং বৈদ্যুতিক যানবাহনের যন্ত্রাংশ আমদানিও ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

 

বাংলাদেশে ব্যবসা করার চ্যালেঞ্জসমূহ

ব্যুরোক্রেসি, দুর্নীতি, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, উচ্চ সুদের হার, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জ। বন্দর জট, বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা এবং প্রশাসনিক বিলম্ব বিনিয়োগের ব্যয় বাড়ায়।

 

চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সুপারিশ

ব্যবসা নিবন্ধন ও অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, আর্থিক খাত সংস্কার, দক্ষতা উন্নয়ন এবং নীতিগত ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা জরুরি। ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এই চ্যালেঞ্জ কমাতে সহায়ক হতে পারে।

 

উপসংহার

বাংলাদেশ আজ স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ীদের জন্য একটি সম্ভাবনাময় বাজার।
তরুণ শ্রমশক্তি, রপ্তানিমুখী শিল্প, ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার এবং সরকারি প্রণোদনার সমন্বয়ে দেশটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের জন্য উপযুক্ত। যথাযথ কৌশল ও নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে বাংলাদেশ আগামী দশকে এশিয়ার অন্যতম প্রধান ব্যবসা ও বিনিয়োগ কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম।

 

63 / 100 SEO Score

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *